আধ্যাত্মিক প্রশ্রয়ে অলৌকিক চোখের দৃষ্টি // তৈমুর খান
‘হৃদয় বাঁচে আত্মার আড়ালে’ সদ্য প্রকাশিত কবি বিকাশ চন্দের লেখা কাব্যগ্রন্থটি খুব ভালো লাগলো। বিগত কাব্যগুলি থেকে কবির মননসঞ্জাত এক আত্ম-উপলব্ধির তীব্র উচ্চারণ একান্ত অভিনিবেশে উঠে এসেছে। আধ্যাত্মিক প্রশ্রয়ে এক অলৌকিক চোখের দৃষ্টি ফিরে পেয়েছেন কবি। যার দ্বারা উপলব্ধি হয়েছে:
“চুপচাপ বেড়ে ওঠে বহুতর শেকড়-বাকড়-
সবার ভেতরে লুকিয়ে একাকী অমল অসুখ।”
এই অমল অসুখ পরমাত্মার নিকট পৌঁছানোর। ‘মঙ্গল শাঁখের ভোর’-এর আগমন টের পেয়েছেন। কারণ কবি জানেন উপনিষদে এই পরম-আত্মার স্বরূপ বর্ণনা করা আছে:
“ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে ।
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ।।”
(ঈশোপনিষদ, আবাহণ)
অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবান সর্বতোভাবে পূর্ণ। তিনি সম্পূর্ণভাবে পূর্ণ বলে এই দৃশ্যমান জগৎ-এর মতো তাঁর থেকে উদ্ভুত সব কিছুই সর্বতোভাবে পূর্ণ। কবির বর্ণনায় এই পূর্ণ সত্তাকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি:
“সম্মোহনের বাঁধনে ছড়িয়ে পড়েছে মোহন অভিজ্ঞান,
আকাশমুখী বাতাস পীত রঙা পাতার আড়ালে কচি পাতা-
অন্বিষ্ট বার্তা নিয়ে ছুঁয়ে গেছে অরূপ রূপের কুমারী কথা।”
সম্মোহনের মোহন অভিজ্ঞান, আকাশমুখী বাতাস, অন্বিষ্ট বার্তা এবং অরূপ রূপের কুমারী কথা সবই ব্রহ্মা স্বরূপ অনন্তের ধারক। পরমাত্মা-ই জীবাত্মাকে অভিভূত করেছে। স্বাভাবিকভাবেই কবির মধ্যে আধ্যাত্মিক আসক্তির টান দেখা দিয়েছে। ‘হৃদয়ে প্রাণের ক্ষত’ ধারণ করেই কবি উচ্চারণ করেছেন:
“খুঁজেছিলাম আলোপথ বাধ্যতায় অন্তিমের শেষপ্রহর।”
আরও বলেছেন:
“বিচ্ছিন্ন বেদনা ঘিরে আছে বিপন্নতায় মায়া মিলনের সুর,”
কবিকে পথ দেখিয়েছে ‘আলোর সারথি’।
অশান্ত ক্লেদময় পৃথিবীর উল্লাস একদিকে, সেখানে শুধু হাহাকার আর বিপন্নতার বিপুল আয়োজন। অন্যদিকে কবি নীরবতার বাতাবরণে আত্মচারী ঐশ্বরিক মুগ্ধতায় পূর্ণের সঙ্গে মিলিত হবার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল:
“ভীষণ রকম যন্ত্রণা ছিল বলে মুক্তির পথ খুঁজি দিন-রাতে,”
এই পার্থিবজীবন কবির কাছে রিক্ত,শূন্য। পুনর্জন্মের প্রতিও নিশ্চয়তা নেই। তাই কবিতায় বলেন:
“পুনর্জন্ম আসে কী না অজানা মোহিনী ঘিরে রাখে সংলাপ”
সমগ্র কাব্য জুড়ে এই ‘মোহিনী সংলাপ’ই মূল উপজীব্য। জীবনের উত্তরণ চেয়েছেন কবি। আর সেই উত্তরণ আধ্যাত্মিক আলোতেই উদ্ভাসিত হতে চেয়েছে। প্রাণের প্রার্থনা:
“আশ্চর্য ছায়ার সময় ঢেকে নেয় আলোর শরীর
আন্দোলিত কথারা স্বপ্নময় শরীরে বাঁচে,
হিরণ্য সময়ের সকল মানুষ তৃষ্ণার্ত বুক-
মহাসভার নির্বাচিত সকলে ভুলে গেল অনিবার্য অসুখ।”
আর তখনই উপলব্ধি হয়:
“ওম শব্দে কেঁপে ওঠে জনপদ অরণ্য আকাশ”
এই ব্রহ্ম শক্তির কাছেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি। জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন:
“সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে— এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;”
এই মুক্তির অদ্ভুত এক বোধ কাজ করেছে কবি বিকাশ চন্দের মধ্যেও। পার্থিব আসক্তি সরিয়ে ঐশ্বরিক মহাজীবনের ইনটুইশন তিনি ধারণ করেছেন ‘হৃদয় বাঁচে আত্মার আড়ালে’ কাব্যটিতে। মানবিক বোধের অফুরন্ত ফোয়ারাও খুলে গেছে। কবি বলেছেন:
“আত্মার গভীরতা বুঝে গেছে অন্য প্রাণের ভাষা”
প্রেম যে অন্য প্রাণের ভাষাও বোঝে তা বলাই বাহুল্য।
ফরাসি পিয়ের টেইলহার্ড ডি চারদিন নামে জেসুইট ধর্মযাজক ,তিনি জীবাশ্মবিদ্যা এবং দর্শনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন এবং পিকিং মানব আবিষ্কারের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আধ্যাত্মিক বোধ সম্পর্কে তাঁর একটি বক্তব্য হলো:
“We are not human beings having a spiritual experience. We are spiritual beings having a human experience.”
(Pierre Teilhard de Chardin)
অর্থাৎ আমরা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষ নই। আমরা আধ্যাত্মিক প্রাণী, যার একটি মানবিক অভিজ্ঞতা আছে। এই মানবিক অভিজ্ঞতাটিই আধ্যাত্মিকতার পর্যায়ে উন্নীত করেছেন বিকাশ চন্দ।
বিষ্ণু সামন্তর সুন্দর প্রচ্ছদ, কবিতিকা প্রকাশনার রুচিপূর্ণ উপস্থাপনায় আশি পৃষ্ঠার কাব্যটি বাংলা সাহিত্যকে গৌরবান্বিত করল।
হৃদয় বাঁচে আত্মার আড়ালে: বিকাশ চন্দ, কবিতিকা, দাম: একশো কুড়ি টাকা।

0 Comments