বাংলা সাহিত্যের প্রতিভাশালিনী মহিলা সাহিত্যিক - সৌম্য ঘোষ
গত শতাব্দীর সপ্তম দশক পর্যন্ত ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। এই সময়ে বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে এমন সব প্রতিভাশালিনী মহিলা আবির্ভূত হলেন যাঁদের গদ্য-পদ্যে আমরা সর্বপ্রথম শিল্পসুষমার আস্বাদ পেলাম, যাঁদের হাতে বঙ্গভারতীর বীণায় মৌলিক নারী-সুর ঝংকৃত হল।
এই সময় থেকে শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত এমন কয়েকজন মহিলা-সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা বঙ্গসাহিত্যে বিশিষ্টতা অর্জন করেন। তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও রচনাবলীর কালানুক্রমিক তালিকা উল্লেখ করা তাঁদের সাহিত্যকৃতির প্রতি ঋণ স্বীকার বলে মনে হয়েছে । এঁনারা আজ বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিস্মিত। আমি মনে করি, তাঁদের স্মরণ করে, তাঁদের জয়গান করা বাংলা সাহিত্যের জন্য জরুরী :—–
Story and Article-এ এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের আজ চতুর্থ পর্ব:
কুসুমকুমারী দেবী
“””””””””””””””””””””””””””
ইনি বরিশালের অন্তর্গত লাখুটিয়ার জমিদার রাখালচন্দ্র রায় চৌধুরীর পত্নী, কবি দেবকুমার রায় চৌধুরীর জননী। কুসুমকুমারী স্বামীর নিকট উৎসাহ লাভ করে নিজের অবসরকাল মাতৃভাষার সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর রচিত পুস্তকগুলির কালানুক্রমিক তালিকা ; তিনি কোনো পুস্তকেই নিজের নাম প্রকাশ করতেন না:
১ স্নেহলতা (সামাজিক উপন্যাস): ১১ মাঘ ১২৯৬ (২৭-২-১৮৯০)। পৃ ১৯২।[৬] “কোন মহিলা কর্তৃক প্রণীত।”২ প্রেমলতা (সামাজিক উপন্যাস): ১১ আশ্বিন ১২৯৯ (ইং ১৮৯২)। পৃ ২৬৮।৩ প্রসূনাঞ্জলি (সন্দর্ভাবলী): ১৩০৭ সাল। (৩০-৯-১৯০০)। পৃ ২৭+১৬।৪ শান্তিলতা (উপন্যাস): (২৭-৯-১৯০২)। পৃ ২৫৭।৫ লুৎফ-উন্নিসা (ঐতিহাসিক উপন্যাস): ১৩১২ সাল (৩-৯-১৯০৫)। পৃ ২০০।
কুসুমকুমারীর পুস্তকগুলি সুধীসমাজে বিশেষভাবে আদৃত হয়েছিল। ‘স্নেহলতা’-পাঠে বিদ্যাসাগর অভিমত প্রকাশ করেন:
“সমাজচরিত্র জানিবার পক্ষে ইহা একখানা সুন্দর গ্রন্থ। স্বাধীন রাজ্য হইলে ইহার পঞ্চবিংশতি সংস্করণ হইত বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।
সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র ‘প্রেমলতা’ পাঠ করিয়া লিখিয়াছিলেন:
“আমার বিবেচনায় গ্রন্থখানি যত দূর উৎকৃষ্ট হইতে পারে, তাহার ত্রুটি হয় নাই। প্রত্যেক পরিবারে এক একখানা প্রেমলতা থাকা বাঞ্ছনীয়।
১৩২২ সালের ভাদ্র মাসে কুসমকুমারী দেবীর অমৃত ধামে গমন করেন।
সরলা দেবী
“”””””””””””””””””””””
স্বর্ণকুমারী দেবীর কনিষ্ঠা কন্যা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগ্নি। জন্ম ১৮৭২ সনের ৯ই সেপ্টেম্বর। ১৮৯০ সালে বেথুন কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বি. এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কবি কামিনী রায় ও লেডী অবলা বসু তাঁর সহপাঠী ছিলেন। ১৯০৫ সালে পাঞ্জাবের আর্য সমাজ-নেতা পণ্ডিত রামভজ দত্ত চৌধুরীর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। ১৯২৩ সনের ৬ই আগস্ট রামভজের মত্যু হয়।
জীবনের দীর্ঘ কাল দেশসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করলেও সরলা দেবী মাতৃভাষার প্রতি উদাসীন ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে শৈশবাবধি সাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। ১২৯২ সালের জ্যৈষ্ঠ-সংখ্যা ‘বালকে’ তাঁহার লেখা প্রথম রচনা—‘দুর্ভিক্ষ (বালিকার রচনা)’ প্রকাশিত হয়। ১৮৮৫ সালের নভেম্বর-সংখ্যা ‘সখা’য় তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত রচনা ‘পিতামাতার প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা কর্ত্তব্য’ স্থানলাভ করে; রচনার শেষে লেখিকার বয়স ‘১২ বৎসর ১১ মাস’ উল্লেখ ছিল।
১২৯৪ সাল থেকে আরম্ভ করে সরলা দেবী ‘ভারতী’তে বহু গদ্য-পদ্য রচনা ও স্বরলিপি প্রকাশ করেছেন; ১৩০০ সালের আশ্বিন-সংখ্যা ‘ভারতী ও বালকে’ তাঁর ‘বন্দে মাতরং’ গানের স্বরলিপি স্থান পেয়েছিল। তিনি বহু বৎসর ‘ভারতী’ সম্পাদনা করেছিলেন। এক সময় তাঁর রচনা সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশংসাও অর্জন করেছিল। সরলা দেবী তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন:
“‘ভারতী’তে আমার আঠার উনিশ বৎসরের লেখা ‘রতিবিলাপ’ [‘ভারতী ও বালক’, বৈশাখ ১২৯১] ও ‘মালবিকা-অগ্নিমিত্র’ [‘ভারতী ও বালক’, পৌষ, ফাল্গুন, চৈত্র ১২৯৮] পড়ে তাঁর লেখা চিঠি। সে চিঠি সাহিত্য দায়রায় দণ্ডায়মান একজন নবীনের উপর তাঁর রায়—বা তাকে দুই বাহু বাড়িয়ে আদর করে নেওয়া। যদিও রবিমামার চিঠিতে তাঁরও appreciation ব্যক্ত হয়েছিল, কিন্তু তাঁর চেয়েও সেদিন সাহিত্যসম্রাট ও সাহিত্যের ন্যায়াধীশ বঙ্কিমের রায়ে নিজেকে বেশি চরিতার্থ মনে করলুম।..শ্রীশ মজুমদার প্রভৃতি বন্ধুদের কাছে বঙ্কিম আমার লেখাগুলি সম্বন্ধে না কি নিজের সবিস্ময় অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন—তা তাঁদের লিখিত বঙ্কিমের জীবন-প্রসঙ্গে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু বঙ্কিমের লিপি আর অন্যের লিপিতে অনেক তফাৎ। বঙ্কিমের লিপিখানি ছিল পুরো বঙ্কিমী ঠাটের সাহিত্যের একখানি হীরের কুচি। বিদূষক সম্বন্ধে আমার মন্তব্যের সঙ্গে তাঁর মতের মিল হয় নি। তার উল্লেখ করে “গরীব বিদষকের” পক্ষ নিয়ে তাঁর সরস লেখনী দুই এক ছত্রে কি হাস্যের ছটাই তুলেছিল। তাই বলছি তাঁর চিঠিখানি ছিল একটি সাহিত্যিক ক্ষুদ্র রসকুম্ভ।”
সরলা দেবী ছিলেন একজন খ্যাতনামা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী। ভারতের প্রথম মহিলা সংগঠন
“ভারত স্ত্রী মহামন্ডল” তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গান্ধীজির সঙ্গে তার বিশেষ ঘনিষ্ঠ সখ্যতা ছিল। তার পাঞ্জাবের শ্বশুর বাড়িতে গান্ধীজী প্রায়শই যেতেন। একটি অসমর্থিত প্রবন্ধে, জানা যায়, গান্ধীজী তার প্রতি এতোখানি আকৃষ্ট হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি সরলা দেবীকে স্ত্রী হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন। তখন গান্ধীজী বিবাহিত ছিলেন এবং স্ত্রী কস্তুরবা দেবীর প্রবল বিরোধিতায় তা সম্ভব হয়নি।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বন্দেমাতরম গানটির সুর সরলা দেবী তৈরি করেছিলেন। “বন্দেমাতারাম” গানটির প্রথম দুটি পদের সুর রবীন্দ্রনাথ দিলেও বাকি অংশের সুর সরলা দেবী তৈরি করেছিলেন।জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মধ্যে তিনিই প্রথম যিনি বাইরে গিয়ে চাকরি করেছিলেন। পরবর্তীকালে
“ভারতী” পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন এবং একসময় ভারতী পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ১৮৯৯ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত এককভাবে এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন পালন উৎসব প্রথম শুরু করেছিলেন তিনি।
সরলা দেবী একজন দক্ষ সংগীতশিল্পীও ছিলেন।
রবিমামার অনেক গানের সুরের খচরা তিনি তৈরি করেছিলেন। তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য, “আমি চিনি গো চিনি তোমারে”, “হে সুন্দর বসন্ত বারেক ফিরাও”, “আমার সোনার বাংলা”, “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে”, “এসো হে গৃহদেবতা”, “একি লাবণ্যে
পূর্ণ প্রাণ” ইত্যাদি।
১৯৪২ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে দেশ পত্রিকায় সরলা দেবীর আত্মজীবনী “জীবনের ঝরাপাতা”প্রকাশিত হয়।
0 Comments