নাম পাখির ঘুড়ি মন উড়ি - ড . ময়ূরী মিত্র
আমার যৌবনের প্রারম্ভ
কলকাতার আকাশে তখন পাখি উড়ত
ঘুড়ি ভোকাট্টা হত
আজো কি তাই
ও ভাই ?
এ লেখাটির নাম দিলাম —
পাখির ঘুড়ি
মন উড়ি
প্রেম করে ঘর পাতব এমনটা কোনোদিনই ভাবি নি আমি | ফলে সে ভীষণ যৌবনবেলায় প্রেমিকের গলা জড়িয়ে আকাশে বেড়ানোচেড়ানোটাই মুখ্য হয়ে উঠেছিল আমার | ভাবতাম —-
যদি বা বাঁধি বাসা
আকাশেতেই ভালোবাসা |
সে হবে এক আকাশবাসা |
তো এই আকাশ আর প্রেমকে ডালভাতের মতো মাখতে গিয়ে প্রেমের দুরকম ধরণ ধরে নিয়েছিলাম | ঘুড়িপ্রেম আর পাখিপ্রেম | ঘুড়িপ্রেম হলো গিয়ে একটুখানি —-আকাশে একবার চক্কর কেটেই ভোকাট্টা | মানে দুদশ দিন কেলেঙ্কারি টাইপ প্রেম হলো ! ব্যাস ! ,তারপরেই প্রেমিক প্রেমিকা যুগলে লাট খাবে যে যার বাড়িতে ! প্রেম খতম শেষবেলার ভাতের হাঁড়ির মতো | বুঝতে যে কেন এত দেরি হয় আপনাদের ?
আরেক হোল পাখিপ্রেম —পাখির মতো অনাদিকাল আকাশকেই ঘর ভেবে চলা | কোথাও বাঁধা পড়বো না বটে তবে এই বাঁধা না পড়াটা কিন্তু একজনের সাথেই রয়ে যাবে | সারাটাজীবন |
দুনম্বরটা চট করে আসে না | আসেই না | আমারো আসেনি | কিন্তু ঘুড়িপ্রেমিক জুটেছিল বিস্তর | এই বিস্তর জুটে যাওয়াতে একধরনের গরিমা হতো ময়ূরাবতীর | জোটাতে বড় ব্যস্ত তখন | একটি রেগুলার আসতো বেথুন কলেজের সামনে | শয়তানটা আসার সময় কোনোদিন নির্দিষ্ট করত না | বেশ বুঝতাম — এই অনির্দিষ্ট থাকাটা তার পূর্ব থেকে নির্দিষ্ট করে রাখা, যাতে দিনের কোনো পিরিয়ডেই মন বসাতে না পারি |
ঘুড়িপ্রেমিকের একটা জিনিস আমাকে টানতো খুব | ক্লাস ফোর ফাইভের বাক্যরচনার স্টাইলে সাজানো প্রেমবাক্য বা গুলবাক্য | চেষ্টা করেও একটি অসঙ্গত শব্দ পাবেন না সেবাক্যে | ক্রিয়াপদের ব্যবহারও প্রতি বাক্যে একই পরিমানে এবং চাক্কু দিয়ে মাখনের স্লাইস কাটার মত নির্ভুল | একদিন যদি বলে —আমি তোমাকে নদীর মতো ভালোবাসি তো পরের দিন অবশ্যই বলতো দীঘি কি সাগরের মত | বলবেই | কলেজের আরো অন্তত চার পাঁচটা মেয়েকে একই কথা বলে যেত সে দিনের বিভিন্ন সময়ে |
পারস্পরিক ভাবে জানাজানি হবার পর বাকি মেয়েগুলো যখন একে অপরকে গরম চোখে দেখত আমি তখন বিল্লিছানার ঘুড়ির সাথে ঘুরতাম | ভরদুপুরে —- উত্তরের পুরনো সব গলিতে | খুব বেছে বেছে লাল তরমুজ কিনত আমার ঘুড়িপ্রেমিক আর সেই মিষ্টি লালজল খেতে খেতে শোনাতো শহরের পুরোনো বাড়িগুলোর বর বৌয়ের গল্প | প্রতিটি গল্প এক | বরগুলো খ্যাপা ষাঁড়ের মতো ভালোবাসে গোলগাল ফর্সা বৌগুলোকে ! আর পরপুরুষের চোখ বাঁচাতে বিকেল না পড়তেই বউগুলোকে মুড়ে ফেলে একরাশ পর্দায় | গল্পশুনে সোয়ামী সোহাগী বউগুলোর নাম দিয়েছিলাম —-বউপ্রিয়া | বরগুলোকে বলতাম — ভীতু ভাতার | অন্যের পয়সায় তরমুজ শুষতে শুষতে অশ্লীল হতাম মনের সুখে |
ঘুড়িপ্রেমিকের গুলগল্পে আর আমার মিথ্যে বিমুগধতায় পার হয়ে যেত বিকেল | ততক্ষণে ফাঁকা তরমুজ ড্রেনে ছুঁড়ে ঘুড়িপ্রেমিক চলত পাড়ার মোড়ের মেয়ে দেখার ডিউটিতে | আর আমি একগাল হেসে ঘুড়ির পকেটের চিরুনি টেনে আমার পাতলা চুল মাথার সাথে সেটিং করতাম | তারপর সোজা বাড়ি ফেরার বাস | মজার কথা —-আমার কাছে কিচ্ছু লুকতো না সে | ঘুড়িকে বড় সৎ লাগত আমার | মিটিংয়ের পর মনে আনন্দ থাকত অনেকক্ষণ | কেন ? তা কি জানি !
অনেকদিন এলো না ঘুড়ি | শুনলাম — তার মা মারা গ্যাছে | সেই প্রথম ছুটতে ছুটতে গেলাম তার বাড়ি | ঠিকানা নিয়ে , অনেক খুঁজে | সেই প্রথম সেই শেষ | ঘরে ঢুকে দেখি —বগি থালায় জম্পেশ করে ঘি দিয়ে ভাত মেখে খেতে বসেছে ঘুড়িপ্রেমিক | পাঁচরকম ভাজাও সাজিয়েছে | মাইরি ! আমায় দেখে ঠোঁট কাঁপালে —শরীরে মাছি বসলে যেমন চামড়াটা কেবল নড়ে | তারপর গর্বে বললে —আমাদের উত্তর কলকাতার বনেদি বংশে এই মেনু হবিশ্যির | অবাক হয়ে দেখেই যাচ্ছি | পলক ফেলছি না —–ঘুড়ির মুখে শোক | চোখে সুগন্ধী অন্ন গেলনের তৃপ্তি | ধুস ! কে যায় আর সেই মিথ্যাচারীর কাছে ?
আর দেখুন ভাই —-মযুরাবতীর তখন হেব্বি ঠাট ! আর কি ছোঁয় সে মরাকাঠ |
ফোট শালা !
পারিস তো সুতো কাট |
বিনে মানজায় উড়ে দেখা |
https://sahityashruti.quora.com/

0 Comments